শনিবার সকাল। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে হিড গেস্ট হাউসের মায়াময় প্রকৃতি দেখতে দেখতে নাশতা শেষ করলাম আমরা। আমরা মানে, ঢাকা থেকে আসা আট সদস্যের দলটি। আগস্ট মাস। তাই আমরা আছি মৌলভীবাজারে। এখানে বৃষ্টি-বাদল বেশ সুলভ। গতকাল বিকেল, সন্ধ্যা ও রাতে কাজের ফাঁকে বেশ ভালোভাবেই বৃষ্টি উপভোগ করেছি। আজও বৃষ্টি হবে বলে মনে হচ্ছে।
আমরা দলবল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য মাধবপুর লেক হয়ে মনিপুরি গ্রাম বুকুলেকি। সেখানে আমাদের দুপুরের খাবারের নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন চারু দিদি। হিড থেকে বেরিয়ে আমাদের গাড়ি চলল ভানুগাছ বাজারের দিকে। সেখান থেকে প্রথমে যাব মাধবপুর লেকে। তারপর চারু দিদির বাড়ি। হঠাৎ আমাদের বাঙালি সত্তা জেগে উঠল। প্রথমবার কারও বাড়িতে যাচ্ছি, খালি হাতে গেলে কেমন দেখায়! কী নিয়ে যাওয়া যায়? গাড়িচালক জানালেন, ভানুগাছ বাজারে একাধিক মিষ্টির দোকান আছে। কারও বাড়িতে গেলে, তাও আবার সময় হাতে থাকলে, মিষ্টির চেয়ে ভালো আর কী-ই বা হতে পারে!
যেই ভাবা, সেই কাজ। আমরা কয়েকজন গাড়ি থেকে নেমে মিষ্টির দোকানগুলোর দিকে হাঁটা ধরলাম। তখন সকাল নয়টা থেকে সাড়ে নয়টা। একটু খুঁজতেই একটি দোকান খোলা দেখতে পেলাম।
ভেতরে যেতেই হরেক রকম মিষ্টির আয়োজন দেখে আমাদের চক্ষু ছানাবড়া! রঙিন লাড্ডু, গোল সন্দেশ, চারকোনা সন্দেশ, ক্ষীরভোগ, ছানার সন্দেশ, কালোজাম, রসগোল্লা—কী নেই সেখানে! মিষ্টি যে বাঙালির সংস্কৃতিতে কতটা জুড়ে আছে, তা আবার উপলব্ধি করলাম। সবাই ইচ্ছেমতো পছন্দের মিষ্টি খেয়ে, ছবি তুলে আর কয়েক কেজি মিষ্টি বাক্সবন্দী করে রওনা দিলাম মাধবপুর লেকের উদ্দেশে।
সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা হইহই করে পৌঁছে গেলাম চা-বাগানে ঘেরা মাধবপুর লেকের সামনে। গাড়ি থেকে নামতেই আবার ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। বৃষ্টিতে ভিজে চা-বাগানগুলো এত সবুজ হয়ে উঠেছে যে চোখ ফেরানো দায়। অদ্ভুত এক মায়ায় জড়ানো পৃথিবী!
গাড়ি থেকে নামতেই আমাদের দিকে এগিয়ে এল দুটি বালক। বয়স সাত-আট বছর হবে। তারা এখানকার স্বঘোষিত ট্যুর গাইড। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, তারা এখানকার চা-শ্রমিকের সন্তান। দুজনই স্থানীয় স্কুলে যায়। আর চা-বাগান, চায়ের দোকান ও লেক এলাকায় পর্যটকদের সঙ্গে নিয়ে ঘোরে।
চা-বাগানের গেটের পাশে চা-পর্ব হলো। অতঃপর দুই গাইড বাবুকে সঙ্গে নিয়ে চললাম। সামনেই একটি দোকানে ভাড়ায় ছাতা পাওয়া যাচ্ছে। আমরাও দুটি ছাতা নিয়ে এগিয়ে চললাম লেকের দিকে।
বৃষ্টিভেজা চা-বাগানের রূপ এখন বেশ খোলতাই হয়ে আছে। দুই পাশে চায়ের গাছ। মাঝে সরু পাকা রাস্তা। এই রাস্তা ধরে কিছুটা এগোতেই চোখে পড়ল অপূর্ব সুন্দর মাধবপুর লেক। সারি সারি শাপলা ফুটে রয়েছে তাতে। হালকা বেগুনি রঙের শাপলা। কি এ মনোহর। হালকা বৃষ্টি আর হাওয়ায় পুরো লেক যেন ভূস্বর্গ হয়ে উঠেছে। সামনেই উঁচু চা-বাগানের সারি। চা-বাগানের সবুজ রং যেন লেকের পানিতেও ফুটে উঠেছে। রাস্তায় দুটি কুকুর শান্তিতে চোখ বুজে হাওয়া খাচ্ছে।
আমরা সবাই নিজেদের মতো প্রকৃতি উপভোগে ব্যস্ত ছিলাম। ছবি তুলছিলাম লেকের, চা-বাগানের, ফুলের। দেখা হলো কয়েকজন ভদ্রমহিলার সঙ্গে। তাঁরা চা-শ্রমিক। প্রথম আলাপেই তাঁরা ছবি তোলার জন্য মাথার টুপি আমাদের দিয়ে দিলেন। শুধু তা-ই নয়, নিজেরাও আমাদের সঙ্গে ছবি তুলতে রাজি হয়ে গেলেন। আবার চা-বাগানে যাওয়ার অনুরোধ করলেন। এত অমায়িক ব্যবহার আর আতিথেয়তা অনেক দিন দেখিনি।
চারপাশে নেই কোনো লোকালয়, নেই তেমন কোনো যানবাহনের শব্দ। কেবল ভেসে আসছে এক বাঁশির সুর। সেই সুর কেমন এক বিষণ্ন সৌন্দর্যে ভরা। সুরের উৎসের সন্ধানে আমরা রাস্তা ধরে এগোতে লাগলাম। একটু হাঁটার পরে দেখা গেল এক বাঁশিওয়ালাকে। মনের সুখে বাঁশি বাজাচ্ছেন তিনি, যেন পৃথিবীর আর কিছুই তাঁকে স্পর্শ করছে না। মায়াভরা সবুজ প্রকৃতির মধ্যে কী যে অদ্ভুত সুন্দর ছিল সেই বাঁশির সুর! আহ!